Plan of Expansion of the Empire of Sultan Muhammad Bin Tughlaq and Causes of Failure of Plans and Its Reactions
রাজ্যবিস্তার পরিকল্পনা (Plan of Expansion of the Empire)
সুলতান আলাউদ্দিন খলজির মতাে মুহাম্মদ বিন তুঘলকও বিশ্বজয়ের উচ্চাশা পােষণ করতেন। এ লক্ষ্যে তিনি রাজ্যবিস্তারের দুটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
১. খােরাসান অভিযান পরিকল্পনা (১৩২৭-১৩২৮ খ্রি.): পারস্যের তৎকালীন ইলখানি শাসক আবু সাঈদের দুর্বল শাসনে। সেখানে বিশৃঙ্খলা ও অরাজক পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল। এ অবস্থায় সুলতানের দরবারে আশ্রয়প্রাপ্ত কিছু খােরাসানি আমির সুলতানকে খােরাসান আক্রমণে উদ্বুদ্ধ করেন। মিসরের মামলুক সুলতান আল নাসির এবং ট্রান্সঅক্সিয়ানার মােঙ্গল শাসক তারমাশিরিন আবু সাঈদের বিরুদ্ধে অভিযানে সুলতানকে প্রয়ােজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন।
তাছাড়া খােরাসানের আর্থিক সমৃদ্ধি ও ধনৈশ্বর্য লাভের হাতছানি সুলতানকে এ অভিযান পরিকল্পনা গ্রহণে প্রলুব্ধ করেছিল বলে মনে হয়। খােরাসান অভিযান পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সুলতান ৩,৭০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করেন। পূর্ণ এক বছর ধরে সৈন্যদের বেতন-ভাতাদি দেওয়া হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সুলতান অভিযান পরিকল্পনা বাতিল করেন। কেননা এ সময় মধ্য এশিয়ায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ট্রান্সঅক্সিয়ানার তারমাশিরিনের ক্ষমতাচ্যুতি এবং মিসরের সুলতান নাসির ও পারস্য সম্রাট সাঈদের মধ্যে মৈত্রী সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ায় সুলতান তার অভিযানের সাফল্য সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়েছিলেন।
ভারত ও খােরাসানের মধ্যকার দীর্ঘ পথে প্রাকৃতিক বাধাও সুলতানকে অভিযান পরিচালনায় নিরুৎসাহিত করেছিল। তাই সুলতান অভিযান পরিকল্পনা বাতিল করেন। সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের খােরাসান বিজয় পরিকল্পনা বাতিল হওয়ায় সুলতানের মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়; রাজ্যের অযথা অনেক অর্থ ব্যয় হয় এবং বহু লােক কর্মহীন হয়ে পড়ে।
২. কারাচিল অভিযান পরিকল্পনা (১৩৩২-১৩৩৩ খ্রি.): সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের চতুর্থ উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ছিল কারাচিল অভিযান (কারাজল বা কুর্মাচল নামেও পরিচিত)। অবশ্য ঐতিহাসিক ফিরিশতা সুলতান চীন বিজয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন। জিয়াউদ্দিন বারানী ও ইবনে বতুতার বর্ণনা মতে, চীনের বিরুদ্ধে নয় বরং চীন ও হিন্দুস্থানের মধ্যবর্তী হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত কারাচিলের হিন্দু রাজ্যের বিরুদ্ধে সুলতান অভিযান প্রেরণ করেছিলেন।
আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, সাম্রাজ্যের উত্তর সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে মুহাম্মদ বিন তুঘলক কারাচিল অভিযানের পরিকল্পনা করেছিলেন। কারাচিল ছিল একটি শক্তিশালী হিন্দু রাজ্য। দিল্লি সালতানাতের সীমান্ত অঞ্চলে এরূপ শক্তিশালী হিন্দু রাজ্যের উপস্থিতি সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য ছিল হুমকিস্বরূপ। এ হুমকি নিরসনে সুলতান ১৩৩২-১৩৩৩ খ্রিষ্টাব্দে তার ভাইপাে খসরু মালিকের নেতৃত্বে কারাচিলে অভিযান প্রেরণ করেন। খসরু মালিকের নেতৃত্বাধীন সুলতানি বাহিনী শত্রুপক্ষের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি দখল করতেও সক্ষম হন।
তবে এরপর সেনাপতির হঠকারিতা, পার্বত্য অঞলের প্রাকৃতিক বাধা এবং আকস্মিক প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে সুলতানের বাহিনী বিপর্যস্ত ও ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সুলতান পার্বত্য সর্দারদের আনুগত্য ও করদানের স্বীকৃতি আদায় করে অভিযানের সমাপ্তি টানেন। জিয়াউদ্দিন বারানী কারাচিল অভিযানকে সুলতানের অন্যতম অপকর্ম এবং ফিরিশতা একে সুলতানের পাগলামি বলে অভিহিত করেছেন। তবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এসব বক্তব্য গ্রহণ করা যায় না। বস্তুত সাম্রাজ্যের উত্তর সীমান্ত সুরক্ষায় সুলতানের গৃহীত ব্যবস্থা তার প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টি প্রকাশ করে।
মুহাম্মদ বিন তুঘলকের পরিকল্পনাসমূহের ব্যর্থতার কারণ
মুহাম্মদ বিন তুঘলকের গৃহীত পরিকল্পনাসমূহের ব্যর্থতার কারণ ঐতিহাসিকেরা নানাভাবে মূল্যায়ন করেছেন। অধিকাংশ ঐতিহাসিক সুলতানের ব্যক্তিগত দোষ-ত্রুটি এবং সীমাবদ্ধতার কথা বলে ব্যর্থতার কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন। তাদের মতে, সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক ছিলেন একজন উন্মাদ এবং তার চরিত্রে ভারসাম্য ও মাত্রাজ্ঞানের অভাব ছিল।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নতুনত্বের আনন্দে তিনি নতুন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তবে নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে এসব অভিযােগ সত্য বলে মনে হয় না। মুহাম্মদ বিন তুঘলক ছিলেন যুগের বিস্ময়। তিনি অবাস্তব কল্পনাবিলাসী বা উন্মাদ ছিলেন না। তার মধ্যে ভারসাম্য, ধৈৰ্য্য ও মাত্রা জ্ঞানেরও যে অভাব ছিল না একথা ব্রিটিশ ঐতিহাসিক গার্ডনার ব্রাউন স্পষ্ট করেই বলেছেন। তার গৃহীত পরিকল্পনাসমূহ যে সুচিন্তিত ও বিচারবুদ্ধিপ্রসূত ছিল তাতে কোনাে দ্বিমতের অবকাশ নেই।
আগা মাহদী হােসাইন বলেছেন “তার পরিকল্পনাসমূহ বাস্তবতা বর্জিত বা মানুষের সম্ভাবনার বা সাধ্যের অতীত ছিল না। বস্তুত তিনি ছিলেন এমন একজন নরপতি যাকে সম্পূর্ণভাবে ভুল বােঝা হয়েছিল।” (He was grossly misunderstood sovereign.) ঐতিহাসিক লেনপুলের মতে, “বিশাল ভারতীয় সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থায় তিনি অনন্যসাধারণ ক্ষমতা ও ধীশক্তির পরিচয় দিলেও তার মহান পরিকল্পনাগুলাে বিস্ময়করভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।” তিনি আরও বলেন, সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সামঞ্জস্যের অভাবে মুহাম্মদ বিন তুঘলক ব্যর্থ হন।”
উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাসমূহের প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন প্রদেশে বিদ্রোহ
সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাসমূহের ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক শক্তি বিনষ্ট হয়। সুলতান প্রজা সাধারণের কাছে অপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এ সময় রক্ষণশীল মুসলিম নেতা ও উলেমারা সুলতানের বিরােধিতা করতে থাকে।
উল্লেখ্য যে, মুহাম্মদ বিন তুঘলকের ব্যক্তিগত উদারতা ও ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা, শরিয়ত বা ধর্মীয় অনুশাসনের বদলে যুক্তি দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার উদ্যোগ, রাষ্ট্রশাসন ব্যাপারে উলেমাদের অযাচিত হস্তক্ষেপ রােধ, নিজেকে আল্লাহর প্রতিনিধি (আল সুলতান জিল্লা আল্লাহ) বিবেচনা এবং খুলিফার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন না করা ইত্যাদি কারণে উলেমা সম্প্রদায় তার প্রতি বিশেষ ক্ষুব্ধ ছিল।
সাম্রাজ্যের বিশেষ দুর্বল পরিস্থিতিতে তারাও সুলতানের বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকেন এবং সুলতানকে ধর্মবিরােধী ও অত্যাচারী আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্য জনতাকে উদ্বুদ্ধ করেন। এ অবস্থায় সুলতান কায়রাের আব্বাসি খলিফার কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায় এবং মুদ্রায় সুলতানের নামের সাথে খলিফার নাম উত্তীর্ণ করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। ১৩৩৫ সাল থেকে সুলতানের বিরুদ্ধে বেশ কিছু বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এর মধ্যে মেবারের বিদ্রোহ ছিল অন্যতম।
১৩৩৫ খ্রিষ্টাব্দে সৈয়দ জালাল উদ্দিন আহসান দক্ষিণ অরতের উপকূলীয় রাজ্য মেবারে স্বাধীনতা ঘােষণা করেন। লাহােরের গভর্নর আমির খলজি এবং দৌলতাবাদের গভর্নরের পুত্র মালিক হুসামও বিদ্রোহ করেন। ১৩৩৮ খ্রিষ্টাব্দে সােনারগাঁওয়ের ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ স্বাধীনতা ঘােষণা করেন। ফলে বাংলা দিল্লি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অযােধ্যা, কারা, বিদর, গুলবার্গ, মুলতান, সুনাম ও সামানা অলেও সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়। এসব বিদ্রোহ দমনে সুলতানকে প্রচুর বেগ পেতে হয়।
বিজয়নগর ও বাহমনি রাজ্যের অভ্যুদয়
এ সময় দক্ষিণ ভারতেও গােলযােগ দেখা দেয়। ১৩৩৬ খ্রিষ্টাব্দে হিন্দু নেতা হরিহর দাক্ষিণাত্যে বিজয় নগর রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ১৩৪৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে কৃষ্ণ নায়েকের নেতৃত্বে হিন্দু সামন্ত নরপতিদের প্রচেষ্টায় বঙ্গল, দ্বারসমুদ্র এবং হােয়াসল রাজ্যে মুসলিম আধিপত্য লােপ এবং হিন্দু প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৩৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দৌলতাবাদের অভিজাতরা আবু মােজাফফর আলাউদ্দিন বাহমান শাহের নেতৃত্বে স্বাধীন বাহমানি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।